মানবতার ফেরিওয়ালা জীবন চৌধুরী
বৃদ্ধ রিকশাচালকের হাতে ১ হাজার টাকা থেকে অসহায় নারীর স্বাবলম্বিতা—ঘরহীন পরিবার ও বন্যার্তদের পাশেও শিল্পপতি জীবন
ব্যস্ততার মাঝেও থেমে শোনেন মানুষের কষ্ট, নীরবে বাড়িয়ে দেন সহযোগিতার হাত—জীবন চৌধুরী ফাউন্ডেশনের মানবিক উদ্যোগে আশার আলো
নিজস্ব প্রতিবেদক:
অর্থ-বিত্ত ও ব্যস্ততার জীবন তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ থেকে। বিপদে পড়া মানুষের কথা শুনে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা, অসহায় নারীদের হাতে কর্মসংস্থানের উপকরণ তুলে দেওয়া, গৃহহীন পরিবারের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি কিংবা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো—বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সমাজসেবক জীবন চৌধুরী।
প্রচার-প্রচারণার চেয়ে মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার এই ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়দের অনেকেই তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা জীবন চৌধুরী ফাউন্ডেশনও অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
রিকশায় ওঠা, মানবতার গল্পে থামা
জীবন চৌধুরীর মানবিকতার একটি ঘটনা তুলে ধরেছেন আশেক আলী খান উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সিনিয়র শিক্ষক মো. আনিসুর রহমান সেলিম।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জরুরি কাজে ঢাকায় গিয়ে বিমানবন্দরে জীবন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সময় নিয়ে কথা বলেন। পরে ফেরার পথে গাড়ি কাছে না থাকায় রিকশায় ওঠেন। রিকশাটি চালাচ্ছিলেন এক বৃদ্ধ।
কথা বলতে বলতে জীবন চৌধুরী জানতে পারেন, বৃদ্ধের তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। এখন তিনি ও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর নিয়েও সংসারের খরচ জোগাতে প্রতিদিন রিকশা চালাতে হয়। কোনো দিন ৩০০ টাকা, আবার কোনো দিন ৫০০ টাকা আয় হয় তাঁর।
গন্তব্যে পৌঁছে জীবন চৌধুরী পকেট থেকে ১ হাজার টাকার একটি নোট বের করে বৃদ্ধের হাতে তুলে দেন। একই সঙ্গে সেদিন আর রিকশা না চালিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে এবং স্ত্রীকে নিয়ে খাওয়ার জন্য কিছু ফল কিনে নিতে বলেন।
ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করা শিক্ষক আনিসুর রহমান সেলিমের কাছে এটি ছিল মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর উপলব্ধি—মানবতা সবসময় বড় আয়োজনের বিষয় নয়; কখনো একজন মানুষের কষ্ট মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় মানবিকতা।
সেলাই মেশিনে স্বাবলম্বিতার স্বপ্ন
অসহায় মানুষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাবলম্বিতার দিকেও নজর দিচ্ছে জীবন চৌধুরী ফাউন্ডেশন।
গত ২৯ জুন ২০২৬ চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার গুলবাহার এলাকায় অসহায় ও দুস্থ নারীদের মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলাই ছিল এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
একটি সেলাই মেশিন একজন নারীর হাতে তুলে দিতে পারে নিজের আয় করার সুযোগ। পরিবারে অবদান রাখার পাশাপাশি আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার পথও তৈরি হতে পারে এর মাধ্যমে।
এ কর্মসূচিতে জীবন চৌধুরীর শ্রদ্ধেয় মায়ের হাত দিয়ে অসহায় নারীদের মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণের বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
গৃহহীন পরিবারের জন্য ঘর
মানবিক সহায়তার পরিধি শুধু আর্থিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ রাখেনি ফাউন্ডেশন। কচুয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অসহায় ও গৃহহীন পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ ও উপহার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একটি ঘর যেখানে একটি পরিবারের কাছে শুধু বসবাসের জায়গা নয়—নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ।
বন্যার্তদের পাশেও জীবন
নিজ এলাকা চাঁদপুরের গণ্ডি পেরিয়ে দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশেও দাঁড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে জীবন চৌধুরীর।
সিলেট-সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ইউনিয়নের বন্যার্ত মানুষের সহায়তায় তাঁর উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্যোগের সময়ে খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে এতিম-দরিদ্র—বিস্তৃত কর্মকাণ্ড
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মসজিদ-মাদ্রাসায় সহযোগিতা, এতিম ও দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো, বিধবা ও অসহায় পরিবারকে সহায়তা দেওয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অবদান রেখে চলেছেন জীবন চৌধুরী।
তবে তাঁর উদ্যোগগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু সাহায্য নয়, মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া।
একজনের উদ্যোগ, বহু মানুষের আশার আলো
একজন বৃদ্ধ রিকশাচালকের হাতে ১ হাজার টাকা হয়তো বড় কোনো অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে সেটিই হতে পারে একজন ক্লান্ত মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ। একটি সেলাই মেশিন হতে পারে একজন নারীর নতুন জীবনের শুরু। একটি ঘর হতে পারে একটি পরিবারের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। আর দুর্যোগের সময়ে বাড়িয়ে দেওয়া সহযোগিতার হাত হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার সাহস।
মানবিকতার এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই বড় হয়ে উঠছে মানুষের জীবনে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “মানুষের জন্য যে মানুষ থেমে দাঁড়ান, তিনিই সত্যিকারের মানবতার ফেরিওয়ালা।”