দেশে মাদকসেবী প্রায় ৮২ লাখ, অধিকাংশই তরুণ; চিকিৎসা পাচ্ছেন মাত্র ১৩ শতাংশ
এম আকবর হোসেন :
দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখে পৌঁছেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যার ব্যবহারকারী প্রায় ৬১ লাখ। এছাড়া ইয়াবা, অ্যালকোহল, কফ সিরাপ, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবহারও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় দেশের ৮ বিভাগের ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, ময়মনসিংহ বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি, ৬.০২ শতাংশ। এরপর রয়েছে রংপুর (৬.০০ শতাংশ) এবং চট্টগ্রাম (৫.৫০ শতাংশ)। তবে সংখ্যার বিচারে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে, যার সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে, মাদকসেবীদের বড় অংশই তরুণ। ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো মাদক গ্রহণ শুরু করেছেন। গবেষকদের মতে, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক নানা সংকট তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক সহজেই সংগ্রহ করা যায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দেশে মাদকাসক্তদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা এখনও অত্যন্ত সীমিত। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদকসেবী চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে ৬৯ শতাংশ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, “মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, গবেষণা এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, দেশে মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে ৭ বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। তিনি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগে মাদকবিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই গবেষণার ফলাফল দেশের মাদকবিরোধী নীতি প্রণয়ন, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।