স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পদোন্নতির তদবিরে ডিজিএফআই মেজর জেনারেলের পরিচয় রেজাউলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা
ষ্টাফ রিপোর্টার:
ডিজিএফআই মেজর জেনারেলের পরিচয় ব্যবহার করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পদোন্নতির তদবির, উত্তর স্টোর কিপার রেজাউল করিম সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিজিএফআই-এর মেজর জেনারেল সৈয়দ এফ এ এইচ রুমীর পরিচয় ব্যবহার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক স্টোর কিপারকে সিনিয়র স্টোর অফিসার পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে বনানী থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টোর কিপার মো. রেজাউল করিম (৪৬), তবদিরবাজ মো. মাসুদুর রহমান (৪৬) এবং অজ্ঞাতনামা আরও চারজনকে আসামি করা হয়েছে। এরমধ্যে মাসুদুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ । রেজাউল করিম বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কুষ্টিয়াতে চাকরির সুবাদে অবৈধভাবে দুর্নীতি ও অপকর্মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে অঢেল সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগে জানা গেছে। তিনি আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে বদলির বাণিজ্য সহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছেন । বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহিঃবিভাগের মেডিসিন স্টোরে পাশে স্টোর কিপার হিসেবে কর্মরত আছেন মো. রেজাউল করিম । ঢামেক হাসপাতালে ৫/৬ বছর যাবত কর্মরক্তর আছেন। এখানে থেকেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে বদলির বাণিজ্য সহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের সাথে জড়িয়ে একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে রেজাউল করিম । এক কথায় বলা যায় আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে অর্থ যোগানদাতা দিচ্ছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এই ব্যাপারে স্টোরকিপার রেজাউল করিমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদক কে জানান, আমার বিরুদ্ধে বনানী থানা একটি মামলা হয়েছে। আমাকে দীর্ঘদিন ধরে কোন পদোন্নতি না দেওয়ার কারণে আমার এক দেশি ভাইকে দিয়ে তবদির করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। তিনি যে এইভাবে অপকর্ম করবেন আমি বুঝতে পারিনি।
বনানী থানার মামলা নম্বর-১৪, তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। মামলায় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৭০/৪১৯/৪২০/৫০৬/১০৯/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে অপরাধের শিরোনাম হিসেবে ‘প্রতারণা’ উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার বাদী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) ডা. মো. কামরুল ইসলাম। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে বনানী থানায় উপস্থিত হয়ে এজাহার দায়ের করেন।
এজাহারে বলা হয়, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল আনুমানিক ৪টা থেকে ১০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআই-এর মেজর জেনারেল সৈয়দ এফ এ এইচ রুমী পরিচয় দিয়ে ০১৭১৩-৬৩৬৬৫৩ নম্বর ব্যবহার করে এক ব্যক্তি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালক (প্রশাসন)-এর মোবাইল নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে বারবার যোগাযোগ করেন। ওই যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টোর কিপার মো. রেজাউল করিমকে সিনিয়র স্টোর অফিসার পদে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছিল বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ওই নম্বর থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালক (প্রশাসন)-এর হোয়াটসঅ্যাপে কল করার সময় মোবাইলের স্ক্রিনে ‘Syed F AH Rumi (M G) DGFI’ নামটি প্রদর্শিত হতো।
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে মো. রেজাউল করিমের পদোন্নতি-সংক্রান্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, পরিচালক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার স্বাক্ষরিত ১৬ পাতার কাগজপত্র নিয়ে মামলার ২ নম্বর আসামি মো. মাসুদুর রহমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যান এবং পরিচালক (প্রশাসন)-এর কাছে তা প্রদান করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘মেজর জেনারেলের পিএ’ পরিচয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রবেশ
এজাহার অনুযায়ী, পরবর্তীতে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটের দিকে মো. মাসুদুর রহমান বনানী থানাধীন মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন)-এর অফিস কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন অফিস সহায়কের কাছে নিজেকে ডিজিএফআই-এর মেজর জেনারেল সৈয়দ এফ এ এইচ রুমীর পিএ হিসেবে পরিচয় দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, অফিস কক্ষে প্রবেশের পর মাসুদুর রহমান পরিচালক (প্রশাসন)-এর সামনের চেয়ারে বসে জানান, ডিজিএফআই-এর মেজর জেনারেল সৈয়দ এফ এ এইচ রুমী তাকে পাঠিয়েছেন। এরপর তিনি মো. রেজাউল করিমের পদোন্নতি-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেওয়ার জন্য বলেন।
তার কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মেজর জেনারেল সৈয়দ এফ এ এইচ রুমীর পরিচয় যাচাইয়ের উদ্যোগ নেন। এ জন্য ডা. হাসিব, ডা. মাহফুজা আক্তারসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করে কর্মকর্তারা জানতে পারেন, ০১৭১৩-৬৩৬৬৫৩ নম্বরটি মেজর জেনারেল সৈয়দ এফ এ এইচ রুমীর নয়। পরবর্তী যাচাইয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ওই মোবাইল নম্বরটি মামলার ১ নম্বর আসামি মো. রেজাউল করিম ব্যবহার করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আটক, পরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর ঘটনাটি জানানো হয় বনানী থানা পুলিশকে। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োজিত আনসার সদস্য মো. জালাল উদ্দিন, আব্দুর রশিদ ও পূর্ণ রায়কে ডেকে এনে ২ নম্বর আসামি মো. মাসুদুর রহমানকে আটক করা হয়।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আটকের পর মাসুদুর রহমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিতে থাকেন। পরে বনানী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে আটক আসামিকে সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বনানী থানায় যান।
মামলার এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারি কর্মকর্তার মিথ্যা পরিচয় দিয়ে অপরের রূপ ধারণ করে প্রতারণামূলকভাবে পদোন্নতির জন্য বিধিবহির্ভূতভাবে নথি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন)-এর অফিস কক্ষে প্রবেশ করেন এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।
দুই আসামির পরিচয়,
মামলার ১ নম্বর আসামি মো. রেজাউল করিম (৪৬) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টোর কিপার হিসেবে কর্মরত। তার পিতা মো. আবু হানিফ খান এবং মাতা মোছা. ছালেহা খাতুন। তার স্থায়ী ঠিকানা কুষ্টিয়ার খোকসা এলাকায়।
২ নম্বর আসামি মো. মাসুদুর রহমান (৪৬)। তার পিতা মো. আবদুস সোবহান এবং মাতা মোছা. আছিয়া বেগম। তার স্থায়ী ঠিকানা কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার চাঁদট এলাকায়। মামলায় তার বর্তমান কর্মস্থলের তথ্য এজাহারে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা দায়েরে বিলম্বের কারণ এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তাদের অনুমতিক্রমে থানায় এসে এজাহার দায়ের করায় মামলা করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ১২টা ৫ মিনিটে থানায় মামলার সংবাদ পাওয়া যায় এবং একই তারিখে মামলাটি রুজু করে আদালতে পাঠানো হয়।
ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বনানী থানাধীন মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন)-এর অফিস কক্ষ, বিট নম্বর-০৬, ওয়ার্ড নম্বর-১৯। বনানী থানা থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব আনুমানিক দুই কিলোমিটার এবং দিক দক্ষিণ-পূর্ব।
১৬ পাতার নথি ও কলের স্ক্রিনশট জব্দ/সংযুক্ত
মামলার সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের স্বাক্ষরিত ১৬ পাতার কাগজপত্র এবং কথিত মোবাইল যোগাযোগের ৫ পাতার স্ক্রিনশট সংযুক্ত করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বনানী থানার সাব-ইন্সপেক্টর মো. ইউসুফ আলী। মামলাটি রেকর্ড করেন ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম।
এখন তদন্তে কথিত ডিজিএফআই পরিচয় ব্যবহার, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের প্রকৃত ব্যবহারকারী, রেজাউল করিমের পদোন্নতি-সংক্রান্ত ১৬ পাতার নথির উৎস ও সংশ্লিষ্টতা এবং মামলায় উল্লেখিত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা যাচাই করা হবে।
তবে মামলায় আনা অভিযোগগুলো তদন্তাধীন; অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আসামিদের দোষী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।