মিরপুর গৃহায়নের উপ- বিভাগীয় প্রকৌশলী সাখাওয়াত ও মাহমুদের সহযোগিতায় সিন্ডিকেটের দুর্নীতি এবং অনিয়মের কর্মকাণ্ড থেমে নেই
মিরপুর গৃহায়নের উপ- বিভাগীয় প্রকৌশলী সাখাওয়াত ও মাহমুদের সহযোগিতায় সিন্ডিকেটের দুর্নীতি এবং অনিয়মের কর্মকাণ্ড থেমে নেই , বদলি হয়েও সার্ভেয়ার মতিনের প্রভাব চলছে , কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন বলে আশ্বাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম ঘিরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সার্ভেয়ার মো. মতিন খান বর্তমানে মিরপুর গৃহায়ন কার্যালয়ে কর্মরত না থাকলেও একাধিকবার বদলি হওয়ার পরও সেখানে তার পূর্বের প্রভাব ও যোগাযোগ পুরোপুরি শেষ হয়নি। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে মিরপুর গৃহায়নে নতুন করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর বর্তমানে মিরপুর গৃহায়নে কর্মরত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাহমুদ ওরফে মাহমুদুল সঙ্গে যোগসাজশ বা সহযোগিতার মাধ্যমে এসব অনিয়মের ধারাবাহিকতা চলছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মতিন খান বদলি হয়ে যাওয়ার পরও তার রেখে যাওয়া প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে মিরপুর গৃহায়নের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এই দিকে চাকরী সুবাদে উপ- বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও মোহাম্মদ মাহমুদ ওরফে মাহমুদুল দায়িত্ব থাকা অবস্থায়ই সরকারি সম্পত্তি, ফাইল নিষ্পত্তি, প্রকল্পের মালামাল ও গ্রাহকসেবা ঘিরে তাদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ দাখিল হয় জাতীয় গৃহায়ণ চেয়ারম্যানের দপ্তরের। এখন আবার নতুন
নতুন বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের অভিযোগ গৃহায়ণের চেয়ারম্যান মোসাঃ ফেরদৌসী বেগমের কাছে অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য দাখিল করছেন । অভিযোগকারীদের কে চেয়ারম্যান আসস্ত করছেন কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আমরা তদন্ত শুরু করেছি । মতিনের পুরনো প্রভাব এবং উপ - বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও মোহাম্মদ মাহমুদ ওরফে মাহমুদুল সিন্ডিকেটের সদস্যদের ভূমিকা— বিষয় নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
উপ -বিভাগীয় প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন ও মোহাম্মদ মাহমুদ ওরফে মাহমুদুল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ,
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-১-এর অধীনে মিরপুর হাউজিং এস্টেটের ৯ নম্বর সেকশনে বাস্তবায়নাধীন ‘স্বপ্ননগর-২য় পর্ব’ প্রকল্পে ১৫টি ১৪ তলা ভবনে মোট ১ হাজার ৫৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পে ব্যবহৃত অকেজো ও অব্যবহৃত মালামালের প্রকৃত মূল্য প্রায় ৭৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে টেন্ডার আহ্বানের আগেই এসব মালামাল বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তীতে বিষয়টি গোপন রাখতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মাত্র ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা মূল্য দেখিয়ে টেন্ডার অনুমোদন নেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই মালামাল বিক্রি হয়ে যায়।
বিক্রয়কৃত অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারি অর্থের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
মো. সাখাওয়াত হোসেন পাবনা জেলার পাবনা সদর উপজেলার তারাবাড়ীয়া পূর্বপাড়া গ্রামের মো. আব্দুল আউয়াল শেখের ছেলে। তার TIN নম্বর ৩৫২৩৮৯৬৬১৬৬৫ এবং কর সার্কেল-০৮ (স্যালারী), রাজশাহী।
অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ও অন্যান্য সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যাংকে বিপুল অর্থ থাকার অভিযোগও রয়েছে। একই অভিযোগে মোহাম্মদ মাহমুদ ওরফে মাহমুদুল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে অঢেল সম্পদ গড়েছেন নামে- বেনামে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফাইল পরিচালনা, গ্রাহক হয়রানি এবং বিভিন্ন কাজের বিনিময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
বদলি হওয়া মতিন খানের বিরুদ্ধে পুরনো ও নতুন প্রভাবের অভিযোগ
মিরপুর গৃহায়নের বর্তমান অভিযোগের সঙ্গে সার্ভেয়ার মো. মতিন খানের নামও উঠে এসেছে। তবে মতিন খান বর্তমানে মিরপুর গৃহায়নে কর্মরত নন; তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, মিরপুর গৃহায়নে দায়িত্ব পালনকালে মতিন খানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দালালচক্রের মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের একাধিক অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তদন্ত করে অনিয়মের তথ্য পান। এমনকি দুইজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। উল্লেখ্য ঃ
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের খবর পেয়ে মতিন খান প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগটি গায়েব করার ব্যবস্থা করেন। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে তাকে মিরপুর গৃহায়ন থেকে একাধিকবার বদলি করা হলেও পরবর্তীতে আবার সেখানে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে তিনি মিরপুর গৃহায়নে কর্মরত না থাকলেও অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের তৈরি করা যোগাযোগ ও প্রভাবের কারণে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নেটওয়ার্ক এখনো সেখানে সক্রিয়। আর সেই নেটওয়ার্কের সঙ্গে বর্তমান উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও মোহাম্মদ মাহমুদ ওরফে মাহমুদুলের সহযোগিতার অভিযোগও সামনে এসেছে।
মতিন খানের পরিচয় ও কর-সংক্রান্ত তথ্য
অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. মতিন খান সিরাজগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে। তার TIN নম্বর ৪৪০৪০০৩৩৩৯৩১, কর সার্কেল ৮৮, কর অঞ্চল ৪, ঢাকা।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিয়ে মতিন খান নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন প্রতিবেদন দাখিল করে সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।
চলতি বছরের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৯৬ সাল থেকে একই এলাকায় দায়িত্ব পালনের অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মিরপুরের রোড নম্বর ১০ ও ১১-এর সংযোগস্থল এবং মণিপুর স্কুলের পশ্চিম পাশে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জমিতে অবৈধ দখলদারদের মাধ্যমে দোকান ও আবাসিক কক্ষ তৈরি করে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
প্রতিটি ঘর থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং প্রতিটি দোকান থেকে গড়ে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সার্ভেয়ার হিসেবে মতিন খান ১৯৯৬ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ওই এলাকার দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। সরকারি সম্পত্তিতে অবৈধ দখল ও ভাড়া আদায়ের বিষয়টি তার দায়িত্বের আওতায় কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে তদন্তের নির্দেশনার দাবি
সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে নতুন করে কয়েকটি অভিযোগ দাখিল গৃহায়ণ চেয়ারম্যানের দপ্তরের।
অভিযোগ সূত্রে আরও বলা হয়েছে, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৩ থেকে উপ-সচিব সিরাজুল ইসলামের স্বাক্ষরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে মতিন খানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
এর আগে ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে যুগ্ম সচিব খলিল আহমেদের স্বাক্ষরিত আরেকটি পত্র সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মো. মতিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অফিসিয়ালভাবে যেসব কাজ করেন, সবই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে করেন। কর্মকর্তারা যেভাবে বলেন, তিনি সেভাবেই কাজ করেন এবং তাদের নির্দেশের বাইরে কোনো কাজ করেন না।
তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই ভালো জানেন বলেও তিনি দাবি করেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ফাইলও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই সরানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। একই বিষয়ে উপ -প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাহমুদ ওরফে মাহমুদুল তার মুঠোফোনে মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করে সাংবাদিকের নাম শোনার পর ব্যস্ত আছি বলে লাইনটা কেটে দেন। এরপর বারবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি আর ফোন রিসিভ করেন নাই। এইজন্য তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়গুলোর ব্যাপারে বক্তব্য পাওয়া যায়নি । আমাদের সাথেই থাকুন পরবর্তী পর্বে আরো ভয়াবহ তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হবে ।